চাহিদা থাকলেও রফতানি নিম্নমুখী

দেশের ৪১ শতাংশ রাবার গাছ অনুৎপাদনশীল

দেশে গত দুই যুগে নতুন কোনো রাবার বাগান তৈরি হয়নি। বর্তমানে সরকারি বাগানগুলোয় ৭৮ লাখের বেশি রাবার গাছ রয়েছে।

দেশে গত দুই যুগে নতুন কোনো রাবার বাগান তৈরি হয়নি। বর্তমানে সরকারি বাগানগুলোয় ৭৮ লাখের বেশি রাবার গাছ রয়েছে। তবে এর মধ্যে আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে যাওয়া, অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়াসহ বিভিন্ন কারণে প্রায় ৩২ লাখ বা ৪০ দশমিক ৬১ শতাংশ গাছ থেকে রাবার উৎপাদন হচ্ছে না। এছাড়া উৎপাদনে প্রযুক্তি ব্যবহার না করার কারণে এ শিল্পের দিন দিন অবনমন হচ্ছে।

এদিকে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের হাতে রাবার বাগানের বড় একটি অংশ পরিচালিত হয়। তবে ভ্যাট-ট্যাক্সের নানা জটিলতায় রাবার আমদানি ও রফতানিতে ভাটা পড়েছে।

দেশে ২০১০-১১ সাল থেকে রাবার বিক্রির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট, টেন্ডারে বিক্রির ক্ষেত্রে আয়কর সেবা খাতে আরো ৯ শতাংশসহ মোট ২৪ শতাংশ কর বহাল রয়েছে। এছাড়া আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে কমিয়ে আনা হয়েছিল।

বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফআইডিসি) ও রাবার বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, এসব কারণে তাদের উৎপাদিত রাবার বিক্রি কমে গেছে। তাছাড়া বিএফআইডিসির কারখানা ও যন্ত্রপাতি পুরনো হয়ে যাওয়া এবং লোকবলের সংকট বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের রাবারের বাজার প্রসারিত হয়নি।

বাংলাদেশ রাবার বোর্ডের পরিসংখ্যান বলছে, বিএফআইডিসির আওতায় বাগানগুলোয় মোট ৭৮ লাখ ৩৩ হাজার ২২১টি রাবার গাছ আছে। এর মধ্যে রাবার উৎপাদন হচ্ছে ৪৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৪৩টি গাছ থেকে। তাছাড়া মোট গাছের মধ্যে জীবনচক্র হারিয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯০০টি গাছ। ২২ লাখ ৮৯ হাজার ১৬টি গাছ অনুৎপাদনশীল ও ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫৯টি গাছ অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় আছে। সুতরাং মোট ৩১ লাখ ৮১ হাজার ৫২০টি বা ৪০ দশমিক ৬২ শতাংশ গাছ থেকে এখন কোনো রাবার উৎপাদন হচ্ছে না।

দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন মোট ১ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে রাবার বাগান আছে। এসব বাগানে ২০২২ সালে মোট উৎপাদিত রাবারের পরিমাণ ছিল ৬৭ হাজার ৯৩৯ টন। বিএফআইডিসির আওতাধীন চট্টগ্রাম জোনে নয়টি রাবার বাগান, সিলেট জোনে চারটি এবং টাঙ্গাইল ও শেরপুর জোনে পাঁচটিসহ মোট ১৮টি বাগানে ৩৮ হাজার ৬৭ একর জমিতে রাবার বাগান আছে। এসব রাবার বাগানে গত বছর মোট উৎপাদন হয়েছিল ৫ হাজার ৯৭২ টন, ২০২২ সালে যা ছিল ৫ হাজার ৭৬৮ টন। এদিকে বিএফআইডিসির বাইরে বেসরকারি খাতের রাবার বাগানের উৎপাদন ৬০-৬২ হাজার টন।

অন্যদিকে ডানকান, ফিনলে, ইস্পাহানি, ব্র্যাক, চিটাগং মেরিডিয়ান অ্যাগ্রো, বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি খাতের ১২টি প্রতিষ্ঠানের কাছে রাবার বাগান আছে ১ লাখ ১ হাজার ৯৯৩ হেক্টর জমিতে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ বাগানগুলোয় প্রায় ৬২ হাজার টন রাবার উৎপাদন হয়।

দেশে রাবারের মান দিন দিন অবনতি হচ্ছে। তাই রফতানির পরিমাণ বাড়লেও আয় কমছে। রাবারজাতীয় পণ্য রফতানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩০ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ডলারের মোট ২ হাজার ৬৩৮ টন রাবার রফতানি হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৪ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলারের ২ হাজার ৮৬৪ টন ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩২ মিলিয়ন ডলারের ৭ হাজার ২৬৮ টন রাবার রফতানি হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরেও ৩২-৩৩ মিলিয়ন ডলারের রাবার রফতানি হয়েছে।

নতুন করে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়াসহ দেশের প্রায় ১ হাজার ৭০০ একর জায়গায় রাবার বাগান তৈরি করা হয়েছে। এর সুফল পেতে অন্তত আরো সাত বছর সময় লাগবে।

বাংলাদেশ রাবার গার্ডেন ওনার্স অ্যাসোশিয়েশনের সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা রাবার উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এসব রাবার বাগান অনেক আগের হওয়ায় গাছের আয়ুষ্কাল কমে গেছে। ফলে রাবার বাগানের পরিমাণ বেশি হলেও উৎপাদন কমছে।’

বাংলাদেশে গত বছরের ডিসেম্বরে কেজিপ্রতি রাবার গ্রেড অনুযায়ী ১৫০-১২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। চলতি মাসে তা বেড়ে গ্রেড অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩২৬ থেকে সর্বনিম্ন ৯৭ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ রাবার বোর্ডের উপপরিচালক (সিনিয়র সহকারী সচিব) শতরূপা তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে রাবার বাগানের ইতিহাস খুবই সমৃদ্ধ। রাবার বোর্ড ও বিএফআইডিসি রাবার বাগানের উন্নয়ন ও উৎপাদনের জন্য কাজ করছে। বাগানগুলো পুরনো হওয়ায় উৎপাদনের পরিমাণ কমেছে। তাই রফতানিতেও কিছুটা প্রভাব পড়েছে।

আরও